Read more
সূর্য্য নমন ও নুতু মিয়ার নামাজ আদায়
সাগর আল হেলাল
ভারতে সূর্য্য নমন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এগুলো সনাতন ধর্মের আচার। হিন্দু পণ্ডিত মনে করছেন, এ গুলো করলে ভবিষ্যতে মুসলিম ছেলেমেয়েরা সনাতন ধর্মে আকৃষ্ট হবে এবং ধর্মান্তরিত হবে। একটা গল্প মনে পড়ে গেলো।
নুতু মিয়া অক্কাস মুন্সীর বাড়িতে বছর মেয়াদী কামলা খাটে। তখনকার দিনে বাৎসরিক চুক্তিতে কামলা রাখার ব্যবস্থা ছিলো। কামলাটিকে গ্রাম্য ভাষায় কিষ্যেণ বা হাল্যে বলা হতো। কারণ তার কাজের মধ্যে অন্যতম কাজ ছিলো হাল বাওয়া। কিষ্যেণ সারা বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতো। তাকে মুনিবের বাড়িতেই থাকতে হতো। মুনিব তাকে পরার লুঙ্গী, কাঁধের গামছা, শীতের চাদর এমন কি চুল আচঁড়ানোর আয়না-চিরুনী পর্যন্ত সরবরাহ করতো। তার মাথায় দেয়ার জন্য আলাদা সরিষার তেলের বোতলও দিতে হতো।
সূর্যোদয়ের পূর্বে হাল্যে হাল নিয়ে মাঠে চলে যেতো। তাকে সকাল ৮টার মধ্যে খাবার পাঠানোর জন্য বাড়ির মহিলাদেরকেও সকাল সকাল ঘুম থেকে জাগতে হতো। বাড়ির মানুষের খাবারের চিন্তা না থাকলেও কিষ্যেণ এর খাবারের চিন্তা ছিলো সবার মধ্যে। খাবার পাঠাতে সামান্য দেরি হয়ে গেলে যেনো তার রাগ না হয়ে যায় এ জন্য বাড়ির মহিলারা তার সাথে হাসি মুখে কথা বলতো। কারণ কিষ্যেণের অভিযোগে কর্তার মাথা গরম হয়ে যেতো। কর্তার মাথা গরম হয়ে গেলে মহিলাদেরকে উত্তম-মাধ্যমের শিকার হতে হতো সে সময়। মোট কথা কিষ্যেণ-এর চাকরী সে সময় বেশ সম্মানের ছিলো। বাৎসরিক ১০দিনের ছুটিও পেতো। আজকালের নৈমিত্তিক ছুটির মতো।
ঈদ, পূঁজা, আড়ংয়ের বেলা, শীতের পিঠা খাওয়া এসব উপলক্ষে কিষ্যেণ ছুটি পেতো। তবে তার দায়িত্বও ছিলো। এলাকার কোন কিষ্যেণ কতো ভোরে ওঠে। তার গরু-বাছুরকে কতো যত্ন-আত্যি করে। কতো সকালে হাল নিয়ে মাঠে যায়। কার চাষে জমি উত্তম কর্ষণ হতো এগুলো নিয়ে প্রতিযোগিতা হলো। পেঁয়াজ, রশুন, আখ ইত্যাদি রোপনের সময় আগের দিনে গৃহস্তরা ব্যাগার আয়োজন করতো। এতো অন্যান গৃহস্তরা আসতো। এবং দল বেঁধে কাজ করতো। সে সময় কিষ্যেণ এর জমি চাষের পরীক্ষা হতো। ফলে কিষ্যেণের পরবর্তী বছরের মাইনে কতোখানি বাড়তে পারে তা অনুমাণ করা হতো।
কিষ্যেণ গৃহস্তের বাড়ির সদস্যদেরকে বয়স অনুপাতে চাচি, চাচা, ভাই, বোন ইত্যাদি সম্বোধন করতো। বাইরে থেকে কেউ হঠাৎ এসে বুঝতেই পারতো না কে কামলা আর কে বাড়ির সদস্য। বাড়ির সদস্যদের আচণের উপরের কিষ্যেণ-এর বেতন নির্ভর করতো। কারণ, যে বাড়ির খাওয়া ভালো, যাদের ব্যবহার মিষ্ট কামলারা সেসব বাড়িতে কম মাইনেতেও কামলা খাটতে রাজি থাকতো।
তো যা বলছিলাম, অক্কাস মুন্সী খুব ভালো লোক ছিলেন। পাশের গ্রামের দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন তিনি। তিনি ওয়াজ মাহফিলে ওয়াজও করতেন। ওনার কণ্ঠস্বরও ছিলো খুব ভালো। শহরের একটা জামে মসজিদে শুক্রবারের খোৎবা পড়েন। এলাকার মানুষ বেশ সমীহ করেন তাকে। বাড়িতে হাল-চাষ এবং নগদ কামাই থাকাতে তার কোনো অভাব ছিলো না। আল্লাহ ওয়ালা অক্কাস মুন্সী তার কিষ্যেণকে খুব বিশ্বাস করতো ও ভালোবাসতো। মুন্সীর স্ত্রীও তাকে সন্তানের মতো ভালো বাসতো। মাইনে টাকা পয়সা চাহিবা মাত্রই দেওয়ার সামর্থও ছিলো মুন্সীর। ফলে নুতু মিয়া এই নিয়ে পর পর ৪ বছর অক্কাস মুন্সীর বাড়ির কামলা হিসেবে খেটে চলেছে। নিজের বাড়ির মতো করে কাজ করে। সৎ, সত্যবাদি সে। মোদ্দাকথা গৃহস্তবাড়ির প্রতি নুতু মিয়ার কোনো অভিযোগ ছিলো না। আবার নুতুর বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ ছিলো না গৃহস্ত পক্ষের। মোদ্দাকথা নুতু মিয়ার সম্পর্ক অক্কাস মুন্সীর পরিবারের সাথে ছিলো মণিকাঞ্চন জোড়ের মতো।
অক্কাস মুন্সীর মনে কেবল একটাই খুত। নুতু মিয়া নামাজ পড়ে না। নুতুকে তিনি বেশ কয়েকবার সালাতের দাওয়াতও দিয়েছে। নুতুকে রাজি করাতে পারেন নি। মুন্সীর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। এমন করলে কেমন হয় ?
নুতুকে ডেকে তিনি বিস্তারিত বুঝালেন। নুতুও রাজী হয়ে গেলো। অক্কাস মুন্সী বেজায় খুশি। এই বুদ্ধিটা আগে আসে নি কেনো মাথায়। দারুণ কাজ হলো। দুপুরে বিকালে আজান শুনেই নুতু মিয়া হাল রেখে, ঘাস কাটা রেখে নামাজ পড়ে। বাইরের মানুষও অক্কাস মুন্সীর খুব প্রশংসা করতে থাকলো। বলতে লাগলো- কথায় বলে নিম তলায় থাকলে নিমের বাও আর সরা তলায় থাকলে সরার বাও লাগে। মুন্সীর সংস্পর্শে এসে নুতু নামাজী হয়ে গেছে।
সমস্যা হলো বছর শেষে এসে। অক্কাস মুন্সী হিসেব করে দেখেন তিনি নুতু মিয়ার মাইনের টাকা কড়ায় কণ্ডায় মিটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নুতু মিয়া বলে- আরও ৫০/- টাকা পাওনা রয়েছে। অক্কাস মুন্সী পড়লেন মহা ফাঁপড়ে। তিনি কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছিলেন না। নুতুকেও তিনি বিশ্বাস করেন পুরোপুরি। তাহলে হিসেবটা মিলছে না কেনো ? অক্কাস মুন্সী গোপনে রাতের বেলা ওনা বেগম সাহেবের সাথেও হিসেবটা মিলিয়ে দেখেছে। ঠিক আছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায় ? নতুকে তিনি মিথ্যাবাদীও বলতে পারছেন না।
পরের দিন অক্কাস মুন্সী নতু মিয়াকে একা ডেকে পাঠালেন। নুতুকে এ কথা সে কথা জিজ্ঞেস করলেন। অবশেষে সকল দ্বিধা সংকোচ ত্যাগ করে খুব মোলায়েম স্বরে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন- নুতু মিয়া তোমার হিসেবটা আমার হিসেবের সাথে মিলছে না কেন ?
নুতু মিয়া অক্কাস মুন্সীর দিকে ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে তাকিয়ে বলে- নামাজ পড়ার ৫০/- ট্যাহা ধরছেন ?
-
সবাইকে ধন্যবাদ
০৭.০১.২০২২




0 Reviews