Read more


একত্ববাদ বনাম কর্তৃত্ববাদ

আলী আজমীর

অযুত নিযুত সংখ্যার মধ্যে গণিতের সংখ্যা থেকে , কথা আমরা সকলেই জানি। গণিতের এই উপাদানের মধ্যে যৌগিক , , বাদ দিলে থাকে , , , , , অঙ্ক ষষ্ঠী। যেনো ছয় ইন্দ্রীয়। যোগী-ঋষি-মুণিষী কতোই না হিসেব কষেছেন গণিতের এই সংখ্যাতত্ত্বের সাথে সৃষ্টিতত্ত্বের। গণিত শাস্ত্রে (শূন্য) অর্থ ফাঁকা নয়। সৃষ্টিতত্ত্বে তা নিরাকার নয়। বস্তু জগতে প্রবেশ করলে সকল হিসেব নিকেশের শুরু -এ। একের বামে শূন্য দিলে গণিতের হিসেবে কোনো হেরফের হয় না, আবার একই ভাবে সৃষ্টিতত্ত্বেও একের পূর্বে শূন্য বিবেচনায় আনলে অর্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। সুতরাং পার্থিব জগতে , , , , এই পাঁচটি মৌলিক সংখ্যা নিয়ে অনেক গবেষণা দেখতে পাওয়া যায়। যারা সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন তাদের কাছে ৫টি সংখ্যার সংখ্যার ব্যাখ্যা মহাসমুদ্রের জল-কে কালি বানিয়ে তা দিয়ে লিখলেও ব্যাখ্যা শেষ হবে না। হবে কি ?

সংখ্যা তত্ত্বের এপাড়-ওপাড় একত্ববাদ বহুত্ববাদ। আলাদাভাবে দুইয়ে পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও সমন্বিতভাবে কি এর মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে ? বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখা যেতে পারে। এক জন মানুষ এক একক, আবার অগণিত মানুষের একটি জাতিও এক একক। এখানে একত্ববাদ বহুত্ববাদ এক এককে বিলীন। বহু এখানে একককেই শক্তিশালী করেছে। একত্ববাদ বহুত্ববাদ সংখ্যার বচনে নয়, বরং একের বিশেষণ হিসেবে পরিগণিত।

হয়তো কথা বলার প্রয়োজন ছিলো না যে, এখানের আলোচনা একত্ববাদ বহুত্ববাদ নিয়ে। একবচন বহুবচন নিয়ে নয়। মৌলিক সংখ্যা দেখিয়ে একত্ব বহুত্ব এর সম্মিলিনের যৌক্তিকতা শক্তিশালী করার জন্যই ইতোপূর্বে মৌলিক সংখ্যা দেখানো দেয়া হয়েছে। একত্ববাদ বহুত্ববাদ বিষয়টি দিয়ে যেহেতু সরল ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলা হয় এবং সমাজের নানা বিভিন্ন স্তরে মারামারি, হানাহানি এমন কি দাঙ্গা বাধিয়ে মানব সমাজের বহুবিধ ক্ষতি সাধন করা হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের সেই বিভ্রান্তি দূর করার নিমিত্তেই এই প্রয়াশ।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একত্ববাদ বহুত্ববাদের মধ্যে পার্থক্য নেই। যারা ধর্ম গ্রন্থ সম্পর্কে ধারণা রাখেন- তারা জানেন যে, ধর্মীয় ব্যাখ্যায়এককশব্দটি ব্যবহৃত হয়। একক শব্দটি বহুত্বকে প্রমাণ করলেও আসলে একত্বে সমাহিত। আরবীতেআহাদশব্দের অর্থ এক একক। যেখানেওয়াহেদবলতে এক বুঝায়। আরেকটি শব্দআল্লাহুম্মা বচন হিসেবে এটা বহুবচন মনে হলেও, এটা আসলে ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষণ হিসেবে।

খৃস্টান ধর্মে, ফাদার, সান এবং হোলি ঘোস্ট সংখ্যায় বহুবচন হলেও তাত্ত্বিকভাবে তা একবচন। কথা যে কোনো খৃস্টান পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তা- বলবেন। অর্থাৎ এখানে বহুত্ববাদ গ্রহণীয় হয়েছে এবং বহুত্ববাদ একত্ববাদকে কলুষিত করতে পারে নি। সনাতন ধর্মেও তা-ই। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ। এখানেও ত্রিশক্তি। সংখ্যায় বহুবচন। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে একবচন। এখনেও বহুত্ববাদ গ্রাহ্য হয়েছে এবং একত্ববাদ বহুত্ববাদে এখানেও কোনো সংঘর্ষ নেই।

উপরের আলোচনা থেকে কথা আমরা সুষ্পষ্টভাবে জানতে পেরেছি যে, তাত্ত্বিকভাবে কোনো ধর্মের মধ্যেই একত্ববাদ বহুত্ববাদ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। যার যার ধর্মের মধ্যে সেই সেই বেশ স্বচ্ছন্দ। তাহলে, এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের, একই ধর্মের এক মাযহাব বা গোত্রের সাথে অন্য গোত্রের এতো দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মারামারি-হানাহানি, দাঙ্গা যুদ্ধ কেন ? সবই হচ্ছে কর্তৃত্ববাদের কারণে। কর্তৃত্ববাদীদের ইশারা ইঙ্গিতেই মানুষে মানুষে আজ এতো বিভেদ। কর্তৃত্ববাদীরাই ধর্মের নানারূপ অপব্যাখ্যা, অপ্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করে তাদের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি করে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখেন। যুগের পর যুগ - হয়ে চলেছে। এর সমাপ্তি কোথায় ? আর এই কর্তৃত্ববাদীরাই বা কারা ?

কর্তৃত্ব করেন যিনি, তিনিই কর্তা। ধর্মীয় চেতনায় সর্বময় কর্তা হলেন, আল্লাহ, ঈশ্বর বা ভগবান। এই সর্বময় কর্তার পৃথিবীর বুকে এসে কর্তৃত্ব করার বিষয় নিয়ে আমরা অগ্রসর হতে পারি।

কর্তৃত্ববাদে কর্তা মূখ্য ভূমিকায়। আর কর্তা সম্পর্কে অবগত হতে কারক সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা আবশ্যক হয়ে যায়। কে বলতে পারে, মহামহিম ঈশ্বরের কর্মযজ্ঞ বুঝাতে গিয়েই কারকের উৎপত্তি ! এবং কালক্রমে তা ভাষার ব্যাকরণে সীমাবদ্ধ হয়েছে! অনুসন্ধিৎসু মানুষ যারা মৌলিক বিষয়ে আগ্রহী, তারা অবশ্যই কারক চর্চা করে থাকবেন।

মহামহিম ঈশ্বর দিবা-রাত্র তাঁর দয়ার ভাণ্ডার হতে নিজ হাতে তার বান্দাদের মাঝে দয়া বর্ষণ করেন। এটি একটি কারক বাক্য। এই বাক্যে সকল কারক বিদ্যমান।

বে বরাতের রাতে আল্লাহ চতুর্থ আসমানে এসে বান্দাদের উদ্দেশে বলেন- কার কি আবেদন আছে পেশ করার জন্য। তাঁর দান সম্পূর্ণ স্বার্থহীন। তিনি যা করেন বান্দার ভালোর জন্য করে থাকেন। নিজের জন্য তিনি কিছুই করেন না। তিনি চিরন্তন, চিরস্থায়ী। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তাঁর সমকক্ষ আর কেউ নেই। এটাই মহামহিমের পরিচয়। বলতে সংকোচ হচ্ছে না যে, মহান কর্তা সম্পর্কে বর্ণনা করতে কারকের সহায়তা ছাড়া কোনো গত্যন্তর হচ্ছে না।

কর্তৃত্বকারীই কর্তা। কর্তৃত্ব হলো তার কর্ম। ক্রিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত পদকে কারক বলে। অন্যভাবে বাক্যে ক্রিয়াপদের সঙ্গে নামপদের যে সম্পর্ক, তাকে কারক বলা হয়। শ্রী কৃষ্ণ উক্তি করেছেনকলি কালে থাকবে শুধু নাম মন্ত্র নাম মন্ত্র জপলেই ঈশ্বর মুক্তিদান করবেন।নাম জপ বলি, এবাদত বলি আর সাধন-ভজন বলি এসব হচ্ছে ক্রিয়াপদ। ক্রিয়াপদের সাথে সম্পর্কযুক্ত পদ ছয় প্রকার। যথাঃ কর্তৃকারক, কর্ম কারক, করণ কারক, সম্প্রদান কারক, অপাদান কারক অধিকরণ কারক।

কর্তৃত্ববাদের অসংখ্য কর্তা বিদ্যমান। একাধিক কর্তা সম্পর্কে জানতেও সেই কারক। কারকে কর্তা প্রকার। ধান ভানতে শিবের গীত না গেয়ে আলোচনা সংক্ষিপ্ত রাখার স্বার্থে কেবল কর্তার নামগুলোই দেয়া হলো।

) মুখ্য কর্তাঃ যে নিজেই ক্রিয়া বা কাজ সম্পাদন করে,

) প্রযোজক কর্তাঃ মূল কর্তার করণীয় কাজ অন্যকে নিয়োগ দিয়ে করে সম্পন্ন করানো হয়,

) প্রযোজ্য কর্তাঃ মূল কর্তার করণীয় কার্য যাকে দিয়ে সম্পাদিত হয়,

) ব্যতিহার কর্তাঃ বাক্যে দুটো কর্তা একই সাথে একই কাজ সম্পাদন করলে, তাদের ব্যতিহার কর্তা বলে।

ক্রিয়াপদে সকল কর্তার কাজই গুরুত্বপূর্ণ। মহামহিম ঈশ্বর যেখানে কর্তা, ধর্মতত্ত্ব তা খুঁজে পাওয়া যায় অপাদান কারকে। সেখানে কিন্তু কোনো কর্তৃত্ব নেই। সেই উৎস স্বয়ম্ভূ। সবকিছু সেখান থেকে হলেও- সেখানের কোনো দাবী নেই। কর্তৃত্ববাদীরা এই সুযোগটাই নিয়েছে। অপাদান কারককে পেছনে রেখে কর্তা কারককেই তারা প্রাধান্য দিয়েছে। পাঠকের সুবিধার্থে অপাদান কারকের সংজ্ঞা নিম্নে দেয়া হলোঃ

 “যা থেকে কিছু বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, বিরত, আরম্ভ, দূরীভূত রক্ষিত হয় এবং যা দেখে কেউ ভীত হয়, তাকেই অপাদান কারক বলে। ধর্ম তত্ত্ব বিশ্লেষণেও মহামহিমের পরিচয় এভাবেই পাওয়া যায়।”

কর্তৃত্ববাদীরা ধর্মহীন কি না, কথা অপ্রাসঙ্গিক। কর্মযজ্ঞে দেখা যায়- কর্তৃত্ববাদীরা যে স্তরে, যেভাবেই থাকুন না কেনো, কর্তৃত্বের জায়গা প্রস্তুত করতে তারা সিদ্ধহস্ত ছিলো। আসমানী কিতাবের ধারণা যতোদিন পৃথিবীতে আসে নাই, তারা নিজেরাই ধর্ম গ্রন্থ রচনা করেছে এবং ধর্মগ্রন্থে নিজেদের কর্তৃত্বের স্থান সুসংহত রেখেছে। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মের প্রচার, প্রসারের জন্য যুদ্ধ-সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছে। পরবর্তীতে আসমানী কিতাবের আবির্ভাবের পর তারা সাময়িক চাপের মধ্যে পড়লেও, প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা সমকালীন ধর্ম গ্রহণ করে নিজেদের জন্য জায়গা সৃষ্টি করে কর্তৃত্ব পুনর্বহাল করেছেন। স্থায়ীভাবে নিজেদের জায়গা বহাল রাখার জন্য বংশতন্ত্র তথা রাজতন্ত্র কায়েম করেছে। তারা চিরকাল ছিলো, আছে, হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে।

প্রাচীন কাল থেকেই তাদের অস্তিত্ব ছিলো। এ জন্যই হয়তোবা তাদের উদ্ভবের কাল সম্পর্কে ইতিহাসে সঠিক কোনো দলিল প্রমাণাদি পাওয়া যায় না। মানব জাতি সৃষ্টির পর থেকেই তারা আছে। সভ্যতার ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, প্রাচীন বা প্রস্তর যুগের ভেতর দিয়েই ব্রঞ্জযুগীয় সিন্ধু সভ্যতা গড়ে ওঠে। এটাকে সিন্ধু সভ্যতাও বলা হয়ে থাকে। ইতিহাস পর্যালোচনায় সিন্ধু সভ্যতার সমাপ্তি রোমান সভ্যতার সূচনায় কর্তৃত্ববাদীদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার সমাপ্তির পর পরই রোমান সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার সূচনা হয় বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এখানেও কর্তৃত্ববাদীদের আগমন সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। তাই সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতা কীভাবে ধ্বংস হয় তা দেখতে গিয়ে দেখা যায়, সবশেষ অধুনা উপগ্রহের মাধ্যমে ভূত্বকের ছবি তুলে এই সভ্যতার বিলুপ্তির প্রকৃত কারণ সম্বন্ধে অনুসন্ধান চলছে। ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ বৈনই পৈসার-এর মতে, সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে মহাজাগতিক বিস্ফোরণে অথবা ধুমকেতুর ধাক্কায় জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটেছিল। ধারণা করা যায়, এর ফলে অঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যায়। এবং সংগত কারণেই এখানকার লোকেরা এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। হরপ্পা বর্তমান পাকিস্তানের পশ্চিম পাঞ্জাবে আফগানিস্তান ইরান ঘেঁষা।

এদিকে রোমান সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ভারতীয় উপমহাদেশে বৈদিক যুগের সূচনা আর্যদের হাত ধরে হয়েছে তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যের সাথে আরও একটি তথ্যের মিল পাওয়া যায় যে, ৪১০ খৃস্ট পূর্বাব্দে মধ্য এশিয়ার ককেশীয় এলাকা থেকে আর্যরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে একদল ইউরোপে অন্যদল ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে গমন করে। আবার ইরান থেকে বেহিস্তান শিলালিপি আবিষ্কৃত হওয়ার পর জানা যায়, যীশুর জন্মের প্রায় ৪৮৬ বছর আগে উৎকীর্ণ শিলালিপির লেখাতে পারস্য সম্রাট দারায়ুস নিজকে দাবী করেন-‘’ A Persian, a son of a Persian and an Aryan of Aryan Descent’’ হিসেবে।

ঐতিহাসিকদের আলোচনায় দেখা যায়, রোমান ধর্মের সাথে বৈদিক ধর্মের অনেক মিল রয়েছে। উভয়েই পৌত্তলিক দেব-দেবীর পূঁজা করতো। শনি দেবতার নাম উভয় গোত্রের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। আচার অনুষ্ঠানে একইভাবে দাস-দাসী, চাকর-বাকর নিম্নশ্রেণির মানুষকে তারা উপহার-উপঢৌকন দান করতো ইত্যাদি। বলা যায় উভয়ের চেতনার মূল একই ছিলো। তাহলে কি কথা বলা যায় যে, আর্য মানেই কর্তৃত্ববাদী ?

কর্তৃত্ববাদীরাই যেহেতু আর্য সমস্যাকে ইতিহাসের একটি জটিল সমস্যার রূপ দান করেছে, এর দায়ও তাদেরই। কেন এটা করেছে তারা ? কারণ পরিষ্কার। তাদের পরিচয় যাতে কেউ ধরতে না পারে, সবাই ডুব দিয়েছে আর্য নামের আড়ালে। আর এ জন্যই এদের পরিচয় এখনও রহস্যাবৃত। একটি মত অনুসারে আর্য বলতে একটি বিশিষ্ট ভাষাগোষ্ঠির মানুষকে বোঝায়। অন্য মত অনুযায়ী আর্য হচ্ছে একটি প্রাচীন জাতিবিশেষ, এবং এটি হল একটি পরিভাষা যা প্রাচীনকালে ইন্দো-ইরানীয় জনগোষ্ঠীর নিজেদেরকে দেওয়া একটি স্ব-পদবি, যা অ-ইন্দো-ইরানীয়" বা অ-ইরানী" বা "অনার্য" ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় মতের সমর্থকদের সংখ্যা বেশি হলেও, প্রথম অভিমতটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত করা হয়নি। আর্য সম্প্রদায়ের উৎস ও অস্তিত্ব নিয়ে যেই পরস্পরবিরোধী অন্ধকার বলয় সৃষ্টি করা হয়েছে তার পেছনেও ঐ কর্তৃত্ববাদীদেরই হাত থাকতে পারে সন্দেহ করার অনেক কারণ রয়েছে। এ জন্য যদি উভয় মতটির দিকে দৃষ্টিপাত করা যায়, তবে তার ইঙ্গিত সহজেই অনুধাবন করা যায়।


একবার ভেবে দেখুন, আর্য একটি নির্দিষ্ট উপাধি নয়, উপাধির ভাবার্থ। আর্য হচ্ছে পুরুষবাচক কর্তা। এর স্ত্রী বাচক শব্দ আর্যা। যার অর্থ সম্মানীয়া স্ত্রী, যেমন- মা, শ্বাশুড়ী ইত্যাদি। তাহলে আর্য অর্থ কী দাঁড়ালো ? সম্মানীয় পুরুষ। সম্মানীয় পুরুষ কি ? উত্তম পুরুষ। উত্তম পুরুষ আর্য, আর উত্তম স্ত্রীলোক আর্যা। তাহলে সাধারণ স্ত্রীলোক বলতে কাদের বুঝায়? তারা হলো- ভার্যা। তবে সাধারণ পুরুষের পরিচয় কী হবে ? এখানেই বপন করা হয় জাতিভেদের বীজ। পদবী সৃজন নীতিমালা।

মানব ইতিহাসের আদ্যপান্ত সম্পূর্ণই ধর্মের রশি দিয়েই ঘেরা। সমাজ-রাষ্ট্র গঠনও ধর্মের ভিত্তিতেই হয়েছে। একত্ববাদ ঈশ্বরের পাশাপাশি বহুত্ববাদের ছায়াতলে কর্তৃত্ববাদের পৌত্তলিকতা আজও বিদ্যমান। একটু চোখ বন্ধ করলেই দিবালোকের মতো স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে প্রতিটি যুগের কর্তৃত্ববাদীদের চেহারা। কখনো আর্য, কখনো ক্যাথলিক, কখনো জায়োনিস্ট, আবার কখনো ব্রাহ্মণ এভাবেই নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে তারা যুগে যুগে। এই বঙ্গদেশের কর্তৃত্ব করার জন্য উত্তম পুরুষরূপে অবতীর্ণ হওয়ার চেষ্টায় রয়েছে বাঙালিরূপে। ১৫০০ বছরের বাঙ্গলা ভাষার প্রাচীন লিখিত রূপ চর্যাপদ আবিস্কার হয় ১৯০৭ সালে। তারপর থেকেই কখনো ভাষাভিত্তিক কখনো জাত ভিত্তিক বিবেচনায় কর্তৃত্ববাদীদের দ্বারা বাঙ্গলাকে নিজেদের কর্তৃত্বে নেয়ার প্রচেষ্টা চলে আসছে। এ যেনো ভৌগলিক হিন্দের কর্তা ব্রাহ্মণ আর বাঙ্গলার কর্তা বাঙালি। ঋগ্বেদে বাঘের নাম নেই। কারণ, ভারতবর্ষের বাঘের দেখা পাওয়া যায় ভার্তবর্ষের পূর্বাঞ্চলে। সে কারণেই বলা যায়, ভারতের পূর্বাঞ্চলের বঙ্গদেশ থেকে এরা অনেকদূরে ছিল। অথচ, বাঙ্গলার উপর ব্রাহ্মণদের কর্তৃত্ব স্থাপনের চেষ্টা চলছে। কখনো ধর্মের দোহাই, কখনো ভাষার দোহাই, কখনো সংস্কৃতির দোহাই দিলেও, অন্তরালে রয়েছে আসলে কর্তৃত্ববাদের কালো থাবা।

গৌতম বুদ্ধ ছিলেন ক্ষত্রীয় অধিপতি। ব্রাহ্ম জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্রাহ্মণের সমালোচনা করেন নি, তিনি জাতিগতভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। বংশে নয় কর্মে উত্তমপুরুষ নির্বাচনের পক্ষে ছিলেন তিনি। তাঁর এই তত্ত্ব ব্রাহ্মণ সমাজের মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়।  দ্বারা নির্যাতিত, নানান জাত-বর্ণে বিভক্ত গরীব দুঃখী মানুষের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য মনে ছিলো। এ জন্য তারা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এবং দলে দলে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বাঙ্গালা ভাষায় দোহা রচনা করে অশিক্ষিত মেহনতি মানুষের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার বিবরণ দিতো। 

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা পৌত্তলিকতাকে আরও বেশি উৎসাহিত করছে। কর্তৃত্ববাদীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বহুত্ববাদের সুফল ব্যখ্যা করতে গিয়ে তাকে ধর্মের সাথে জুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

-