Read more
বিনাশের কোন পথে বাংলা সাহিত্য
- আলী আ’রিয়ান
অন্ধকারকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাই খুঁজে পাই না রাত্রি। নিদ্রাটি ছিলো জেগে জেগে এজন্যই ভাঙছিলো না ঘুম, বুঝতেই পারি নি। অন্ধকারের জন্য দেখতে পাওয়া যায় সূর্য প্রমাণ করার ক্ষমতা না থাকলেও- দিনের বেলা যে চাঁদ দেখতে পাওয়া যায় না, তা সবাই জানে। আসলে আলোর মধ্যে বাস করে যেমন আলো দেখা যায় না, একইভাবে অন্ধকারে বসে অন্ধকারকে ধরা যায় না। আমাদের অবস্থা হয়েছে তেমন।
প্রাসঙ্গিক কথাঃ
বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৮ সালের বাংলা একাডেমির বইমেলায় সর্ব মোট ৪ হাজার ৫৯১টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যার বইয়ের মধ্যে মাত্র ৪৮৮টি বই মানসম্পন্ন বলে বিবেচিত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকাশিত নতুন বইয়ের মাত্র ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ মানসম্পন্ন। পরিসংখ্যানটি নিম্নরূপঃ কবিতার বইঃ ১ হাজার ৪৭২টি, গল্পের বইঃ ৭০১টি, উপন্যাসঃ ৬৪৩টি, প্রবন্ধঃ ২৫৭টি, শিশুতোষঃ ১২৫টি, গবেষণাঃ ১২২টি, ছড়াঃ ১১২টি, ইতিহাসঃ ১১০টি, জীবনীঃ ১০৭টি, মুক্তিযুদ্ধঃ ৯১টি, ভ্রমণঃ ৯১টি, বিজ্ঞান ক্যাটাগরিতেঃ ৭৬টি, সায়েন্স ফিকশনঃ ৬৫টি, চিকিৎসা বিষয়েঃ ৩৩টি, অনুবাদঃ ৪৮টি, নাটকঃ ২৩টি, রম্যঃ ২১টি, রাজনীতিঃ ২২টি, ধর্মীয়ঃ ২৬টি, রচনা বইঃ ১৫টি, অভিধানঃ ৭টি এবং অন্যান্যঃ ৪২৪টি। এ বছর বইমেলায় কম্পিউটার বিষয়ে নতুন কোনো বই আসেনি। (বইমেলার নতুন বইয়ের তালিকা থেকে এই তথ্য জানা যায়।)
মূল্যায়নঃ
বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকা জনাব আসাদুজ্জামান নূর এমপি বলেন, বইমেলায় শুধু নতুন বই আসলে হবে না, বরং মানসম্পন্ন বই বের করতে হবে। উনার সুরে সুর মিলিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার বলেন, শত বই না লিখে, সৃষ্টির জন্য একটি বই লিখুন। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার ও আসদুজ্জান নূরের বক্তব্য কয়জন নতুন বইয়ের লেখক পর্যন্ত পৌঁছাবে তা ভবিতব্য বলতে পারবে। তবে, যারা সৃজনশীলতার কথা বলেন এবং যাদের পর্যন্ত এই বার্তা পৌঁছেছে তারা যদি এ বিষয়ে কোন কথা না বলেন- সময় এবং বিবেকের কাছে তারা অবশ্যই ঋণী রয়ে যাবেন।
এ দায় কারঃ
দুইজন বিশিষ্ট্য ব্যাক্তি বই প্রকাশের সঙ্গে জড়িত দুইটি পক্ষের কথা বলেছেন। প্রধান অতিথি বলেছেন প্রকাশকদের দায়ের কথা আর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার ইঙ্গিত করেছেন লেখকদের প্রতি। বিষয়টি খুবই মজার। যেন ডিম আগে না মুরগী আগের মতো অবস্থা। একজন লেখক যদি ভালো লেখা না লিখেন তাহলে প্রকাশক কিভাবে ভালো বই প্রকাশ করবেন। আবার একজন প্রকাশক যদি ভালো বই প্রকাশ না করেন, তাহলে যারা ভালো লিখেন তারা বই লিখে কি করবেন ? জরিপ করে দেখা যায়, বিশেষ করে কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রে প্রকাশিত অধিকাংশ বইয়ের লেখকই নতুন। তাহলে কি দায় এই নতুন লেখকদের ! তাই-ই বা হতে যাবে কেন। নতুন লেখকদের যদি সুযোগ দেওয়া না হয়, তাহলে উনারাই বা পুরতন হবেন কি করে ?
শেষ কথাঃ
ফেসবুকে পোস্ট দেবো বলেই লেখাটি যথা সম্ভব ছোট করার চেষ্টা করলাম। আসলে সমস্যা দু’দিকেই। বই প্রকাশনা সংস্থা এখন বাণিজ্যিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে। উনারা, ভালো বই প্রকাশের আগে চিন্তা করেন, বই প্রকাশ করে কিভাবে লাভবান হওয়া যায়। নতুন লেখকের সৃজনশীল একখানি ভালো বই বিক্রয়ের নিশ্চয়তার অভাবে তারা নিজেদের খরচে প্রকাশে আগ্রহী হয় না। বরং তারা রয়্যালটি দিয়ে হলেও বড়ো লেখক বা যাদের লেখা বই বিক্রয়ের নিশ্চয়তা আছে কেবল সেদিকেই মনোযোগী হন। নতুন লিখিয়েরা এখানে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে, নতুন লেখকদের মধ্যে একটা শ্রেণি আছে যারা লেখালেখিকে একটা প্যাসন হিসাবে দেখে থাকেন তারা একটা বই প্রকাশের জন্য প্রকাশকের ইনভেস্টের দিকে চেয়ে থাকেন না। প্রয়োজনে নিজেরাই ইনভেস্ট করে বই প্রকাশ করে ফেলেন। টাকা নিয়ে বই প্রকাশ করতে গিয়ে প্রকাশকগণ এ সকল লেখকবৃন্দের লেখা এডিট করার দুঃসাহসও দেখাতে পারেন না। ফলে সম্পাদনা ব্যাতিরেকেই অসংখ্য কবিতার বই প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। এই সকল নতুন লেখক আবার বই বিক্রয় হচ্ছে কি হচ্ছে না তা নিয়েও মাথা ঘামান না। অন্য শ্রেণিতে রয়েছেন ভিআইপি লেখক। সমাজের অনেক ভিআইপি আছেন- যারা জীবনে অনেক টাকা পয়সা রোজগার করেছেন, অবসর সময়ে কি করবেন। কবিতা লিখছেন, বই প্রকাশ করছেন। এই শ্রেণির লেখকদের বই আবার তার বন্ধু মহলে বিক্রয়ও হচ্ছে। এ সকল পাঠক প্রকৃতপক্ষে লেখার মান দেখেও বই ক্রয় করেন না, কেনেন বন্ধুর লেখা বই। কিছু কবি লেখক আছেন, ফেসবুক গ্রুপ রাজনীতির কারণে ব্যাপক লাইক কমেন্টস পেয়ে ভেবে নিচ্ছে তাদের বইয়ের অনেক কদর হবে, উনারা কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করে বই প্রকাশ করছেন। সেখানেও ৩০০-৪০০ লাইক পাওয়া কবিতা এডিট করার প্রয়োজন আছে বলেও তিনি মনে করছেন না। এভাবেও নিম্নমানের বই প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। আরেক পক্ষ রয়েছেন নবীন প্রকাশক গ্রুপ। উনারা ফর্মা প্রতি টাকা নির্ধারণ করে রাখেন, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলে বই প্রকাশে কোন বাধা থাকে না।
উপসংহারঃ
ভালো বই প্রকাশের দায় প্রকাশক এবং লেখক দু’জনকেই নিতে হবে। প্রকাশক আগের দিনের মতো প্রতিভা অন্বেষণপূর্বক ভালো লিখেন এমন নতুন লেখককে সুযোগ দিতে হবে। আর লেখকগণও কেবল মাত্র টাকার জোরে অথবা ফেসবুকে প্রাপ্ত লাইক কমেন্টস এর উপর ভিত্তি করে বই প্রকাশে অবতীর্ণ হওয়া থেকে বিরত থাকবেন। ভালো লিখুন। দশটি সাদামাটা বই প্রকাশের চেয়ে একটি উত্তম বই প্রকাশ হলে, লেখক, প্রকাশক, পাঠক এবং বাংলা সাহিত্য সকল সেক্টরই লাভবান হবেন। ভালো লিখুন। ভালো বই কিনুন এবং ভালো বই প্রকাশ করুন। ধন্যবাদ।
-




0 Reviews