Read more

শেঁকড়

- সাগর আল হেলাল

 

বাথরুমের পারদ মাখা স্বচ্ছ কাঁচের দিকে তাকিয়ে অশ্রুনদীর তাণ্ডব দেখছিল ইউসুফ। কিছুক্ষণ আগেই মুখের ভেতর আঙ্গুল দিয়ে বমি করে বেসিন ভরে ফেলেছিলো সে। এতো বমি করেছে যে, বেসিনের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বেসিনের কল খোলা। উপচে পড়া পানিতে ভেসে যাচ্ছে পায়ের তলার পরিষ্কার টাইলস্ এর মেঝে। কোন ভ্রুক্ষেপ নেই ইউসুফের। সে গভীর মনযোগে যেন কেবলই নিজেকে দেখছে। এভাবে নিজেকে ভাবে নি সে কোনদিন। যমুনার বাঁধ ভাঙা অবস্থা আজ ইউসুফের চোখে। চোখ দিয়ে পানি এসে সারতে পারছে না বলে নাক দিয়েও অশ্রু এসে যাচ্ছে। নাকের ও চোখের পানি একাকার হয়ে ঠোঁট স্পর্শ করে পড়ছে ঐ মেঝেতেই। ইউসুফ এ সবে কিছুই মনে করছে না আজ।

 

হিথ্রো এয়ারপোর্টে সে যেদিন প্রথম পা রাখে, মনে পড়ে সেদিনের কথা। ভিন্ন চ্যানেলে তার লাগেজ এবং তাকেও স্বাগত জানিয়েছিলো লন্ডন এর মাটি। নিজের প্রতি সেদিন প্রচণ্ড রাগ হয়েছিলো। আত্ম পরিচয়ের গ্লানি তাকে খুন করেছিলো নিষ্ঠুরভাবে। সভ্যতার চরম শিখরে ওঠা ইউরোপে এমন বর্ণ বৈষম্য ! সে বাঙালি বলে তার জন্য অন্যরকম ব্যবস্থা ? নিজের যোগ্যতা বলেইতো সে লন্ডনে পড়ার সুযোগ পেয়েছে ! তাহলে ? তার প্রতি কেন এই অবহেলা ? জ্ঞান-বিজ্ঞানে বাঙালিরা যে আগের মতো পিছিয়ে নেই, সে কথা কি ওরা জানে না ? নিজের প্রতি তার অনেক রাগ হয়েছিলো। রাগ হয়েছিলো দেশের মাটির উপরেও। হিথ্রো বিমান বন্দরে তার প্রতি যেই বৈষম্য দেখানো হয়েছিলো, তাতে তার বাঙালি হওয়ার গৌরব ভেঙে খান খান হয়ে যায়। সেদিনই সে প্রতিজ্ঞা করেছিলো প্রিয় মাটিকে সে ভুলে যেতে চায়। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, এই কথাটি সে আর মুখে আনবে না। টিএসসিতে দাঁড়িয়ে জন্মভূমির সম্মানে দেয়া প্রতিটি স্লোগান মন থেকে একেবারে মুছে দেবে সে। সেই প্রতিজ্ঞা আজও সে ভোলে নি। খুব ভালো করে তার মনে আছে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে সে প্রথমে থাকার জায়গায় যায়। তারপর সকল কাজের আগে ঢাকা থেকে আনা সমস্ত কাপড়চোপড় কুচি কুচি করে কেটেছিলো কাঁচি দিয়ে। চুলের রং পরিবর্তন করে বাদামী করেছিলো এরপর শুরু হয় নতুন যাত্রা। পড়া-লেখার ফাঁকে ফাঁকে সে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে মুখের ভাষা প্রিয় মাতৃভাষাকে ইরেজার দিয়ে যেন ঘসে মেজে তুলে ফেলেছিলো। আদব কায়দা, চলনে-বলনে একদম কেতাদুরস্ত বিলেতি হয়ে যায় ইউসুফ। নামের উচ্চারণেও পরিবর্তন এনে করে ফেলে ইউসেফ

 

এরই মধ্যে কেটে গেছে প্রায় ১২ বছর। সবাই তাকে এখন একজন ইউরোপীয়ান হিসাবেই চেনে, জানে। গভীর রাতে নিজের কালো চুল বাদামী করার কাজ চালু রেখেছে এখনো। কিন্তু আজ তার কি হয়েছে ? কেন তার এই মানসিক অবস্থা ! বাসায় ঢোকার আগে সে মাথার চুল সেভ করে এসেছে। মুখে নিজের নাম ইউসুফ উচ্চারণ করার প্রাণান্ত চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় বমি করেছে।

 

অফিসের বস আজ সবাইকে নিয়ে একসাথে ২০১৫ বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড বনাম বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা দেখেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি ভালো পারফরমেন্সে ইংল্যান্ডের মানুষ বাহবা দিচ্ছিলো। তারা বাংলাদেশের খুব প্রশংসা করছিলো। খেলা শেষে ইউসুফ বসকে খুশি করার জন্যই হয়তোবা ইংল্যান্ডের সাপোর্টে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো। বস একটা বকা দিয়েছে। বলেছে- বাংলাদেশ ইজ এ নাইচ কান্ট্রি। দি পিপল অব বাংলাদেশ ইজ ভেরী গুড। দে আর এ্যাকচুয়াল টাইগার।

 

বন্ধ বাথরুমে ইউসুফ এবার চেচিঁয়ে কেঁদে ওঠে। দুহাত উপরে তুলে চিৎকার করে বলে ওঠে- আমি বাঙালি ! এয়ার টাইট বাথরুমের সেই আওয়াজ বাইরের কেউ শুনতে পায় না।

-

০৬.০২.২০২২