Read more


জলের মধ্যে নদী

- ঘুমখোর

বেড়াল এক স্বার্থপর গৃহপালিত প্রাণি। সে বিশ্বস্ত নয়, যেমনটা বিশ্বস্ত কুকুর। বেড়ালকে মুখ মুছা প্রাণিও বলা হয়ে থাকে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, পাশের বাড়ির বেড়ালকে যতো কিছুই খাওয়ানো হোক না কেনো, সে যাবার সময় বাড়ির প্রধান ফটকে মুখ মুছে তবেই বিদায় নেয়। এ জন্যই বোধ করি তপস্বী নামের সাথে বেড়াল শব্দটি যুক্ত করলে ভণ্ড বুঝায়। শব্দ সৃষ্টির ইতিহাস খুঁড়লে এমন অনেক মজার্থ খুঁজে পাওয়া যায়। ভাষাবিদ্ নমস্য তুমি। বেড়ালের আরও একটা স্বার্থপরতার দিক রয়েছে। যাদের বাড়িতে বেড়াল আছে এবং যারাই বেড়ালের বাচ্চা জন্ম দেওয়া এবং তার প্রতিপালন সম্পর্কে লক্ষ্য করেছেন, তারা সবাই জানেন যে- বেড়াল বাচ্চা প্রসব করে খুবই গোপনে। প্রসব যন্ত্রণা সে প্রকাশ করে না। আপনার ঘরের চাতালে অথবা কার্ণিশে বইপত্রের আড়ালে বেড়াল কবে বাচ্চা দিয়েছে তা আপনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারবেন না। আপনি যখনই জানবেন, বুঝে নেবেন বেড়ালও বুঝে নিয়েছে এবং তার বাচ্চাকে আর ঐ জায়গায় পাওয়া যাবে না।

বেড়াল তার বাচ্চাকে এক স্থানে বেশি দিন রাখে না। তাকে যেনো কেউ স্পর্শ করতে না পারে সেদিকে তার তীর্যক খেয়াল। যদি তার বাচ্চাকে স্পর্শ করেন, বেড়াল বুঝে যাবে এবং সে আর ঐ বাচ্চাটিকে গ্রহণ করবে না, এতোটাই স্বার্থপর সে। এ গল্প বলার উদ্দেশ্য হলো, বেড়াল যেমন গৃহপালিত প্রাণি, মানুষও তেমনই।

মানুষ যেনো আজ বেড়ালের স্বভাবী। একান্নবর্তী পরিবার এখন দূরবীণেও দুষ্কর। যতটি সন্তান, ততোটি ঘরের দিন শেষ-এখন, যতোটি সন্তান- ততোটি বাড়ি। কেউ কারো মুখ দেখতে চায় যায়। এমনও বাড়ি আছে, শুধুমাত্র দরজা ঘুরিয়ে আলাদা বাড়ি বানানো হয়েছে। ভাবছেন, টকদই নিয়ে আলোচনায় এ সব কথা কেন ? আসলে এই কথাগুলো টকদইয়ের মতোই বিস্বাদ, তিক্ত তাই। বাবা-মায়ের কাছে যা শিখবে, তাই-তো করবে আজকের শিশু আগামীতে। সেইসব শিশুকে উদ্দেশ করেই কিছু তিক্ত কথা ছন্দাকারে প্রকাশিত হয়েছে সাগর আল হেলাল রচিত ছড়াগ্রন্থ টকদই-এ।

টকদই

সাগর আল হেলাল

প্রকাশকালঃ ২০১৪

শিশু অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। সুবিধা বঞ্চিত শৈশবের উদ্দেশে অর্পিত। শৈশব হোক সবুজ সতেজ নির্মল হাসিখুশি। এ কথাগুলি লেখা আছে বইটির উৎসর্গ সম্পর্কে। বুঝাই যায়, ছড়াকার শৈশব বঞ্চিত শিশুদের বেদনাভরা মনে কি প্রলেপ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। আমরা বলে থাকি আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। সেই শিশু যদি হয় শৈশব বঞ্চিত, অবহেলা অনাদরে ক্ষতবিক্ষত তাহলে কি করে তার আত্মার বুনিয়াদ মজবুত হবে ! একটি দালানের ভিত্তিমূল যদি যথার্থ না হয়, তাহলে তার টিকে থাকার নিশ্চয়তা কি ?

টকদই প্রকাশ করেছে সদর প্রকাশনী। ১১/১ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ নুপুর আক্তার। মুদ্রণ ঢাকা প্রিন্টিং প্রেস, বাংলা বাজার। ISBN : 978-984-8845-59-2.

বোর্ড বাঁধাই ম্যাগাজিন সাইজের ৩২ পৃষ্ঠার টকদই এর প্রতিটি পাতায় ছবি আঁকা ছড়া সামঞ্জস্যে। অফহোয়াইট রঙের কাগজে মুদ্রিত টকদই মজার মজার ছড়া রয়েছে ৩০টি। তবে ছড়াগুলির একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য  রয়েছে, আর তা হলো শিশুদের জন্য প্রতিটি লেখাতেই একটি বিশেষ মেসেজ। শিশুদের জন্য যা তিক্ত হলেও অপরিহার্য্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কথায় আছে উচিৎ কথা সব সময়ই অম্ল-মধুর হয়ে থাকে। বইয়ের প্রথম ছড়াটি এমন-

 

ছড়া শিরোনাম: অধিকার

 

বলছে শিশু মাকে ডেকে

ওমা দেখে যাও

আমার কাছে এই শিশুটা

বলছে ভিক্ষা দাও।

 

আমি তো চাই জামা-কাপড়

খাদ্য-খানা সোহাগ আদর

ভিক্ষা আবার কি জিনিস মা

আমায় রেখে খাও !


আমি শিশু সে-ও শিশু

সমান অধিকার

তাকে যদি ভিক্ষা দেবে

চাই সেটা আমার !


কী অদ্ভত ব্যাপার ! একজন শিশু, ভিক্ষাই যার উপজীব্য। অপরজন জানেই না, ভিক্ষাটা আসলে কি ? এই যখন সামাজিক অবস্থা, তেমন সময়ে টকদই একটা বিশেষ বার্তা বহন করে বৈকি। একটা শিশু ভুমিষ্ট হয়েই অধিকার পায় নাগরিকত্বের। পায় অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারের দাবী। অথচ এই দাবী তার ধরা-ছোঁয়ার অনেক দূরে। অধিকার বঞ্চিত এই শিশুর কাছে ভবিষ্যৎ কি কোন দাবী রাখার নায্যতা রাখে ? ছড়াকার একজন শিশুর চোখ দিয়ে সমাজকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন সমসাময়িক সমাজের হালচিত্র, দুরাবস্থার উপাখ্যান।

বর্ণ-বৈষম্য বর্তমান সময়ের এক মারাত্মক ব্যাধি। বর্ণে-বর্ণে, ধর্মে-ধর্মে, উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম নানা অজুহাতে চলছে নিধন যজ্ঞ। এহেন হানাহানি-কাটাকাটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের কোমলমতি হৃদয়। ভেতরে ভেতরে তারও হয়ে উঠছে যুদ্ধংদেহী। কিশোর অপরাধের দিকে দৃকপাত করলে তা সহজেই অনুমেয়। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ তারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আমরা আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিজ হাতে ধ্বংস করে দিচ্ছি। না দিচ্ছি তাদের কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা, না মানছি তাদের দাবীর ন্যায্যতা। আমরা তাদেরকে বঞ্চিত করে চলেছি। আসলে যে আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বঞ্চিত করছি তা বুঝতেই পারছি না। টকদই বইটির দ্বিতীয় ছড়াটি এমন-

 

শিরোনাম: মানুষ

 

সাদা মানুষ কালো মানুষ

রক্ত একই, তাই-

মানুষ হয়ে মানুষেরে

দুঃখ দিতে নাই।

 

খুব সুন্দর একটি ছড়া। এ ছড়াটির আরেক জায়গায় বলা হয়েছে-

 

মানব প্রেমে মুক্তি মেলে

দাও মানবে ভক্তি ঢেলে

দুখী মানুষ রুগী মানুষ

বুকে দেবো ঠাঁই

জন্ম নিয়ে সবার আগে

মানুষ হতে চাই।

 

শিশুদের মনে মানবিক মূল্যবোধ জাগৃত করার জন্য ছড়াকারের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। শিশুর কোমল মনে যদি মানবীয় সুকুমার প্রবৃত্তিগুলো জাগিয়ে তোলা না যায়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ যেমন অন্ধকার, তেমনই অন্ধকার দেশ ও দশের ভবিষ্যৎ।

 

চলবে-